কলকাতা টাইমস নিউজ | নিউজ ডেস্ক | কলকাতা

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১২ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ এবং তার পরবর্তী গণহিংসার ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে এবার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (Suo Motu) হস্তক্ষেপ করল জাতীয় মহিলা কমিশন (NCW)। কমিশনের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজিপির কাছে আগামী সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট (ATR) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ষণ-খুন, তদন্ত, গণপিটুনি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্যাতিতার পরিবারের পুনর্বাসন—সমস্ত বিষয়েই পৃথকভাবে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।

জাতীয় মহিলা কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ঘটনা অত্যন্ত নৃশংস ও উদ্বেগজনক। কমিশন জানতে চেয়েছে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং পকসো (POCSO) আইনের যথাযথ ধারা প্রয়োগ করে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে কি না। পাশাপাশি, সমস্ত অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার, বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতেই বিশ্বাসী এবং এই ঘটনায় কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।

ঘটনার পর এলাকায় যে গণপিটুনি এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, সেটিকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে কমিশন। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে কি না, কোথাও কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নাবালিকার ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং নির্যাতিতার পরিবারের জন্য চিকিৎসা, মানসিক পরামর্শ, আইনি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়েও বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার। বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কিনতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল বছর বারোর ওই নাবালিকা। দীর্ঘক্ষণ বাড়ি না ফেরায় পরিবার থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করে। তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চার যুবকের সঙ্গে তাকে শেষবার যেতে দেখা গিয়েছিল। পরদিন সকালে ধবধবি ও সূর্যপুর স্টেশনের মাঝামাঝি একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হয় তার দেহ। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় দেহ রেখে বিক্ষোভে সামিল হন। পরে উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে এক সন্দেহভাজনের মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।

তদন্তে ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার-সহ তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আরও তিন জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান মিলিয়ে ঘটনার পূর্ণ ক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধর্ষণ, গণধর্ষণ, খুন, প্রমাণ লোপাট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। পাশাপাশি পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারাও প্রয়োগ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে টোটো করে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই সময় সে দাবি করছে, নাবালিকা চিৎকার শুরু করলে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার তার গলায় পা চেপে ধরে এবং পরে তিন সহযোগীকে নিয়ে তাকে টেনে বাগানের ভিতরে নিয়ে যায়। অভিযুক্ত আরও দাবি করে, ঘটনার সময় তারা মদ্যপ অবস্থায় ছিল। যদিও ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে সরকারি ভাবে এখনও কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তদন্তকারীরা ভিডিওটি খতিয়ে দেখছেন এবং এটি মামলার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে আদালতে ধৃতদের পুলিশি হেফাজতের আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে মঙ্গলবার আদালতে পেশ করা হবে। অন্য দুই অভিযুক্ত দিবাকর সর্দার এবং প্রভাস মণ্ডলকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, এই মামলায় রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—‘জিরো টলারেন্স’। নির্যাতিতার পরিবারের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ করবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি নিখোঁজ ডায়েরি হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও পৃথক মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধেও কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে প্রশাসন।

জাতীয় মহিলা কমিশনের হস্তক্ষেপ, বিশেষ তদন্তকারী দলের তদন্ত, ভাইরাল ভিডিওর সূত্র এবং প্রশাসনের কড়া অবস্থান—সব মিলিয়ে বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনা এখন শুধু একটি অপরাধমূলক মামলা নয়, বরং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এক বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

 

NCW Seeks 7-Day Report on Baruipur Minor Rape-Murder Case, Viral Confession Video Adds New Twist to Probe

Baruipur Minor Rape Murder Case

The National Commission for Women has taken suo motu cognizance of the Baruipur minor rape and murder case, seeking a detailed Action Taken Report from West Bengal Police within seven days. As the SIT probe intensifies and a viral confession video surfaces, the case has triggered widespread outrage and renewed focus on women's safety and justice.