কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক :

নবান্নের বদলে ফের রাইটার্স বিল্ডিংস বা মহাকরণ থেকে রাজ্য প্রশাসন পরিচালনার পরিকল্পনাকে সামনে রেখে তৎপরতা শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী-সহ ছয় মন্ত্রীর জন্য চেম্বার প্রস্তুত করার পাশাপাশি মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজির বসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে ঐতিহাসিক এই ভবনে। পূর্ত দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, মহাকরণের অসম্পূর্ণ সংস্কারের একটি বড় অংশ আগামী ৯ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই ২৪ সেপ্টেম্বর আদানি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাইটার্স বিল্ডিংস পরিদর্শনে আসার কথা। ফলে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং শিল্পগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে মহাকরণকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির তরফে একাধিকবার জানানো হয়েছিল, নবান্ন নয়, ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংস থেকেই রাজ্য সরকার পরিচালিত হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলা সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় সেই পরিকল্পনা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে রাজ্যের প্রধান সচিবালয়ের কাজ নবান্ন থেকেই চলছে। মহাকরণকে প্রশাসনিক কাজে ফের ব্যবহার করতে গেলে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিকাঠামো, দফতরগুলির বসার ব্যবস্থা এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণের মতো একাধিক বিষয় সমাধান করা প্রয়োজন।

এই পরিস্থিতিতে বুধবার মহাকরণ পরিদর্শন করেন রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী অজয় কুমার পোদ্দার। পরিদর্শনের পর তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সচিবালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ঘরের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকজন মন্ত্রী, মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজির জন্য চেম্বার প্রস্তুত করা হচ্ছে। সংবাদসূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীর জন্য একটি ঘর এবং তাঁর নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের জন্য আরও দুটি ঘর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্তমন্ত্রী ছাড়াও পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, পর্যটন ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের জন্যও ঘর প্রস্তুত করা হচ্ছে। মুখ্যসচিব ও রাজ্য পুলিশের ডিজির জন্য পৃথক ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়েছে।

তবে মহাকরণের সমস্ত অংশ এখনও ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। পূর্তমন্ত্রী জানিয়েছেন, ক্যাবিনেট রুম এবং রোটান্ডার মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ এখনই সম্পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ধাপে ধাপে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পূর্ত দপ্তরের অসম্পূর্ণ কাজ ৯ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও সম্পূর্ণ সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনের কাজ আরও দীর্ঘ সময় নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাইটার্স বিল্ডিংসের সংস্কারে আদানি গোষ্ঠীর আগ্রহ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, আদানি গোষ্ঠী ভবনটির সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইতিমধ্যে গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে ভবনটি পরিদর্শন করেছেন। ঐতিহ্যবাহী ভবন সংস্কারের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্থপতি অঞ্জন মিত্রকে এই কাজের প্রাথমিক মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে সংস্কারের সম্ভাব্য খরচ ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, কাজের পরিধি এবং অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে এখনও সরকারি স্তরে সম্পূর্ণ স্পষ্টতা প্রকাশ্যে আসেনি।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর আদানি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ফের মহাকরণে আসার কথা। একই সময়ে বাংলায় আরও কয়েকটি প্রকল্পের সূচনার সম্ভাবনার কথাও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর মধ্যে নিউ টাউনে ২,০০০ শয্যার হাসপাতাল এবং কলকাতার কুমারটুলি ঘাট পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাসপাতালের প্রস্তাবিত শয্যার একটি অংশ আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংবাদসূত্রের দাবি। যদিও এই প্রকল্পগুলির সময়সীমা, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের শর্তাবলি সম্পর্কে চূড়ান্ত সরকারি নথি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত সমস্ত তথ্যকে প্রস্তাব বা পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

মহাকরণ সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও মূল কাঠামো সংরক্ষণ নিয়ে। ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের দফতর হিসেবে গড়ে ওঠা এই ভবন পরবর্তী সময়ে বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৭৭৭ সালে নির্মাণের কাজ শুরু হওয়া রাইটার্স বিল্ডিংস দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার প্রশাসন এবং স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতর এই ভবনে পরিচালিত হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রধান সচিবালয় নবান্নে স্থানান্তরিত হওয়ার পর মহাকরণের গুরুত্ব কমলেও ভবনটির ঐতিহাসিক মর্যাদা অটুট রয়েছে।

সংস্কারের নামে ভবনের পুরনো বৈশিষ্ট্য নষ্ট হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। পূর্ত দপ্তরের সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ভবনের কয়েকটি অংশে বহু বছরের পুরনো ইউরোপীয় টাইলস সরিয়ে তার জায়গায় মার্বেল বা গ্র্যানাইট বসানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পূর্তমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে ঐতিহাসিক সম্পদ নষ্ট করা যাবে না। তিনি নিজে মহাকরণ পরিদর্শনের সময় ১৮৫৭ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ছবি ও নথি দেখেছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

পূর্তমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হলেও ব্রিটিশ শাসনের প্রতি কোনও আকর্ষণ নেই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ঐতিহাসিক স্থাপত্য বা সম্পদ ধ্বংস করা হবে। মহাকরণে থাকা একাধিক ঐতিহাসিক সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংস্কারকাজে আধুনিকতার পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে রাজ্যের প্রধান সচিবালয় মহাকরণ থেকে হাওড়ার নবান্নে স্থানান্তরিত হয়। সেই সময় ভবন সংস্কারের জন্য সাময়িকভাবে দফতর সরানো হয়েছিল বলে জানানো হলেও পরবর্তী ১৩ বছরেও সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। সংবাদসূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কাজ চললেও ভবনের বড় অংশ এখনও পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। এর ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে রাইটার্স বিল্ডিংসকে ফের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।

এই অবস্থায় আদানি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে ঘিরে একদিকে যেমন আশাবাদ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই প্রশ্ন উঠছে সরকারি ঐতিহ্যবাহী ভবনের সংস্কারে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে। প্রকল্পটি যদি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা অন্য কোনও কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তার প্রশাসনিক অনুমোদন, অর্থব্যবস্থা, কাজের স্বচ্ছতা এবং সংরক্ষণ নীতি স্পষ্ট করা জরুরি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহাসিক ভবনের ক্ষেত্রে শুধু সৌন্দর্যায়ন নয়, মূল স্থাপত্য, পুরনো উপকরণ এবং ভবনের ঐতিহাসিক চরিত্র রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের চেম্বার প্রস্তুত করার উদ্যোগ থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার অন্তত আংশিকভাবে ভবনটিকে প্রশাসনিক কাজে ফিরিয়ে আনার পথে এগোতে চাইছে। তবে নবান্নের বিকল্প হিসেবে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র মহাকরণে স্থানান্তরিত হবে কি না, হলে কবে হবে এবং কোন কোন দফতর সেখানে বসবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর আদানি গোষ্ঠীর পরিদর্শন এবং পূর্ত দপ্তরের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মহাকরণ সংস্কারের প্রকৃত অগ্রগতি আরও পরিষ্কার হতে পারে। বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ভবনকে আধুনিক ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি তার ঐতিহাসিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখা—এখন সরকারের সামনে সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

Writers’ Buildings Revival Plan: Chambers for CM and Six Ministers Being Prepared Ahead of Adani Group Visit

 

The West Bengal government is preparing office chambers for the Chief Minister six ministers the Chief Secretary and the Director General of Police at the historic Writers’ Buildings in Kolkata.

The move comes amid plans to revive Writers’ Buildings as the administrative centre of West Bengal instead of Nabanna. The Public Works Department has set a target to complete a major portion of the pending work by October 9.

The Adani Group is expected to visit Writers’ Buildings on September 24 as part of discussions surrounding the proposed restoration and redevelopment of the heritage structure. The project has also raised questions about heritage conservation the preservation of historic architectural features and the role of private corporate participation.