কলকাতা টাইমস নিউজ | নিউজ ডেস্ক | কলকাতা | ৩০ জুন
উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় আবারও গভীর প্রশাসনিক সংকটের মুখে। গত দু’বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী উপাচার্য নেই। সেই অচলাবস্থার মধ্যেই এ বার মেয়াদ শেষ হওয়ায় দায়িত্ব ছাড়লেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাস। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি, সেমিস্টার পরীক্ষা, ফলপ্রকাশ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের মুখে এই পরিস্থিতি ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং আধিকারিক— সকলের মধ্যেই প্রবল উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জুলাই মাস থেকেই নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। এরপর রয়েছে বিভিন্ন স্নাতকোত্তর ও গবেষণা স্তরের সেমিস্টার পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার— দুই শীর্ষ প্রশাসনিক পদ কার্যত শূন্য হয়ে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলিও দীর্ঘদিনের অস্থিরতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে পরিষেবা বন্ধ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাস জানান, তাঁর নির্ধারিত দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি নিজের বিভাগে শিক্ষকতার কাজে ফিরে গিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শিক্ষা দপ্তর সম্পূর্ণ অবগত বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে এর বেশি কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
প্রশাসনিক অস্থিরতার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় নানা বিতর্ক, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলেছে। বামফ্রন্ট সরকারের শেষ পর্বে তৎকালীন উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের মধ্যে সংঘাত প্রকাশ্যে চলে আসে। সেই সময় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীকালে সরকার পরিবর্তনের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং শিক্ষা দপ্তর এবং রাজ্যপালের মধ্যে উপাচার্য নিয়োগ সংক্রান্ত মতবিরোধ প্রশাসনিক জটিলতাকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।
এর পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনা, ভর্তি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিষেবার জন্য বেসরকারি সংস্থা নিয়োগ নিয়েও একাধিকবার বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কর্মচারী ও আধিকারিক নিয়োগ, আর্থিক প্রশাসন এবং পরিষেবা পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
২০২৪ সালে তৎকালীন উপাচার্য বিদায়ের আগে একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে কর্মচারীদের নিয়োগ, রেজিস্ট্রার পদে শিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব দেওয়া এবং অস্থায়ী কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে মতবিরোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এমনকি ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের সরকারি ই-মেলের পাসওয়ার্ড ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে, যা প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ এখনও শূন্য। ফলে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণেই তৈরি হচ্ছে জটিলতা। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একাংশের মতে, দ্রুত স্থায়ী উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং অন্যান্য আধিকারিক নিয়োগ না হলে নতুন শিক্ষাবর্ষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংকট কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে কি না, তা নিয়েও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষা মহলের আশা, উচ্চশিক্ষার স্বার্থে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্রুত স্থায়ী প্রশাসনিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা হবে। কারণ উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এই সংকটের দ্রুত সমাধানের উপর।
Continue With Google
Comments (0)