কলকাতা টাইমস নিউজ  :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :২২ ডিসেম্বর

বাংলাদেশের অশান্ত উপত্যকায় আরও একবার মানবতার পরাজয়। ২৭ বছরের হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাস—যাঁর অপরাধ ছিল শুধু ‘অভিযোগ’, বিচার হয়নি, সত্য যাচাই হয়নি—শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেলেন না পুলিশের হাতের নাগালেই থেকেও। নতুন প্রকাশ্যে আসা ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ভয়ংকর পরিণতির ঠিক আগেই তিনি পুলিশের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে প্রকাশ্য চত্বরে পিটিয়ে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়।

ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের Mymensingh জেলার Bhaluka শহরে, ১৯ ডিসেম্বর। অভিযোগ—ধর্ম অবমাননা। সেই অভিযোগকে ঘিরেই উত্তেজিত জনতার হাতে নৃশংস মৃত্যু দীপু চন্দ্র দাসের।

নিরাপত্তা সংস্থার সূত্র এবং ভাইরাল ভিডিও অনুযায়ী, ঘটনার আগে দীপু আশ্রয় নিয়েছিলেন ভালুকা থানার ওসি Humayun Kabir-এর কক্ষে। ভিডিওতে দেখা যায়, গাঢ় নীল শার্ট পরা দীপু ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে পুলিশের কাছে নিজেকে বাঁচানোর অনুরোধ জানাচ্ছেন। থানার বাইরে তখন উত্তেজিত জনতা তাঁকে ‘হস্তান্তর’ করার দাবিতে চিৎকার করছে।

কিন্তু সেই আশ্রয়ই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি নিরাপদ। কীভাবে বা কোন পরিস্থিতিতে তাঁকে থানার ভেতর থেকে বের করে আনা হয়—তা এখনও অস্পষ্ট। কিন্তু নিশ্চিত, থানার কয়েক কদম দূরেই তাঁর মৃত্যু অপেক্ষা করছিল।

তদন্তে উঠে এসেছে, দীপু কর্মরত ছিলেন ফিনিক্স নিটিং লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানায়। সেখানেই প্রথম তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু হয়। কারখানার ভেতরের ভিডিওতে দেখা যায়—একদল কর্মী তাঁকে ঘিরে কিল-ঘুষি, লাথি মারছে। কোনওক্রমে পালিয়ে তিনি থানায় পৌঁছান, আশ্রয় চান পুলিশের কাছে।

কিন্তু সেখান থেকেই হয় তাঁকে জোর করে বের করে আনা হয়, নয়তো তাঁকে তুলে দেওয়া হয় উত্তেজিত জনতার হাতে। এরপর ভালুকা টাউন স্কোয়ারে তাঁকে একটি খুঁটিতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। অভিযোগ, তখনও তিনি জীবিত ছিলেন। গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরানো হয়, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা উল্লাস করে।

ঘটনার পর ২০ ডিসেম্বর তদন্তভার নেয় Rapid Action Battalion-এর RAB-14 ইউনিট। RAB-14-এর ডিরেক্টর Naimul Hassan দাবি করেন, কারখানা কর্তৃপক্ষই দীপুকে জনতার হাতে তুলে দেয়।

একই সুরে কথা বলেন Dhaka Metropolitan Police-এর অতিরিক্ত কমিশনার Nazrul Islam। তাঁর বক্তব্য, দীপুকে কারখানা থেকেই তুলে নেওয়া হয়।

কিন্তু নতুন ভিডিও প্রমাণ এই সরকারি বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। থানার ভেতরে দীপুর উপস্থিতির দৃশ্য প্রশাসনিক অবহেলা না কি প্রত্যক্ষ সহযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে—তা নিয়েই উঠছে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন।

এই লিঞ্চিংয়ের সময়েই গোটা বাংলাদেশ জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, উগ্র সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা Sharif Osman Hadi ওরফে ওসমান গনি-র মৃত্যু। ঢাকার পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

একই দিনে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছিল। এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনার আবহেই দীপু চন্দ্র দাসের মতো সংখ্যালঘু যুবক প্রাণ হারালেন—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দীপুকে পুলিশের হেফাজতে দেখানোর ভিডিও সামনে আসতেই স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা—তাঁরা কী করলেন, কী করলেন না, আর কেন করলেন না—এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়বে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

একজন যুবকের শেষ আর্জি , পুলিশের ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে বলা সেই কথাগুলো—আজ শুধু একটি ভিডিও নয়, গোটা ব্যবস্থার দিকে তোলা এক ভয়ংকর প্রশ্নচিহ্ন।