বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই যে প্রশ্ন উঠেছিল, শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর সেই প্রশ্ন আরও তীব্র, আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি, নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি, মনোনয়ন জমা থেকে প্রতীক বরাদ্দ—সব কিছুই কাগজে–কলমে এগোচ্ছে ঠিক নিয়মে। কিন্তু রাস্তায়? রাস্তায় এখন শুধুই আক্রোশ, আতঙ্ক, আর অবিশ্বাস।
প্রশ্ন তাই একটাই—এই অবস্থায় আদৌ কি বাংলাদেশে নিরাপদে ভোট সম্ভব ?
প্রসঙ্গত ইনকিলাব মঞ্চের নেতা এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ শরিফ ওসমান হাদি–র মাথায় গুলি লাগে ১২ ডিসেম্বর। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মারা যান।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার শাহবাগ থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী থেকে খুলনা—বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়। আগুন–ধোঁয়া–বাঁশের মিছিল—উত্তেজনা যেন থামার নামই নেয় না।
হাদির মৃত্যু নিছক এক রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়—এটি যেন ২০২৪–এর জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিকে আবার উস্কে দিয়ে বাংলাদেশের অচলাবস্থাকে নতুন করে সামনে এনে ফেলল।
যদিও বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতি দেয়নি। কিন্তু কালের কণ্ঠ–এর রিপোর্ট অনুযায়ী কমিশনের ভিতরে আতঙ্ক বাড়ছে। সূত্র বলছে—রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের দফতরে নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা জানিয়েছেন কমিশনকে।নির্বাচনকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
যখন নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত—তখন ভোটের পরিবেশ কতটা নিরাপদ, তা ভাবাই যায়।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ–৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী মহম্মদ মাসুদুজ্জামান এই সপ্তাহেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। তাঁর কথায়—“জীবন নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশে নেই।”
বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে হাদির মৃত্যু–পরবর্তী তাণ্ডবের পরে। বলা হচ্ছে, ‘গুপ্তঘাতকের ভয়’ এখন নির্বাচনী রাজনীতির প্রধান ফ্যাক্টর।
অপরদিকে ভারত ইতিমধ্যেই বলেছে—বাংলাদেশে অবাধ, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বস্ত নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—“নির্বাচন নিয়ে ভারতের নসিহত আমরা চাই না।”তাঁর কঠোর মন্তব্য—“গত ১৫ বছরে প্রহসনমূলক নির্বাচন নিয়ে ভারত চুপ ছিল। এখন কেন উপদেশ দিচ্ছে?” রাজনৈতিক উত্তেজনার এই বহুমাত্রিক চাপ বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করছে।
যদিও নির্বাচন কমিশন কাগজে–কলমে সব ঠিকঠাক পরিকল্পনা করেছে—
-
মনোনয়ন দাখিল: ১২–২৯ ডিসেম্বর
-
যাচাই–বাছাই: ৩০ ডিসেম্বর–৪ জানুয়ারি
-
আপিল নিষ্পত্তি: ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত
-
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা: ২১ জানুয়ারি
-
প্রচার: ২২ জানুয়ারি–১০ ফেব্রুয়ারি
-
ভোটগ্রহণ: ১২ ফেব্রুয়ারি
কিন্তু মাটির বাস্তবতা বলছে—হিংসা, আতঙ্ক, নিরাপত্তা সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই ক্যালেন্ডার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।
হাদির মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক ক্ষতি নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।যে দেশে ছাত্র আন্দোলনের নেতা নিরাপত্তাহীনতায় প্রাণ হারান, যে দেশে প্রার্থীরা নির্বাচন এড়িয়ে যান, যে দেশে নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য—সেই দেশে কি অবাধ ভোট সম্ভব?
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ কমছে।বিদেশি কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তুঙ্গে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সামনে যে ভয়ংকর পরীক্ষা অপেক্ষা করছে—তা এখন দিনের আলোয় দেখার মতো স্পষ্ট।
Comments (0)