কলকাতা টাইমস নিউজ  :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :২০ ডিসেম্বর

অসমের হোজাই জেলায় শনিবার ভোরে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। সাইরাং–নয়াদিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেসের ধাক্কায় মারা গেল ৮টি বন্য হাতি। গুরুতর আহত একটি শাবককে বন দফতর উদ্ধার করেছে। ভারতীয় রেলের ইতিহাসে হাতি–মৃত্যুর অন্যতম ভয়াবহ এই ঘটনা শুধু পরিবেশপ্রেমীদের নয়, গোটা অঞ্চলের মানুষকে গভীর শোক ও ক্ষোভে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দুর্ঘটনার জেরে ব্যাহত হয়েছে উত্তর–পূর্ব ভারতের রেল পরিষেবাও।

রেল ও বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মিজোরামের সাইরাং থেকে দিল্লির দিকে আসছিল রাজধানী এক্সপ্রেস।
হঠাৎই হোজাইয়ের কাছে লাইনের ওপরে উঠে পড়ে একটি হাতির দল।

লোকো পাইলট জরুরি ব্রেক কষলেও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি।
ধাক্কার জেরে ইঞ্জিন ও পাঁচটি কোচ লাইনচ্যুত হয়ে যায়। লাইনের দু’পাশে ছড়িয়ে পড়ে হাতিদের দেহাবশেষ।

সৌভাগ্যবশত কোনও যাত্রী মারা যাননি। তবে ট্রেনের গতি থেমে যায়, এবং রুটে রুটে ট্রাফিক বাধাপ্রাপ্ত হয়।

বন দফতর নিশ্চিত করেছে, মোট ৮টি হাতি প্রাণ হারিয়েছে।স্থানীয়দের দাবি—পালটিতে ৮টিই ছিল এবং সংঘর্ষের তীব্রতা মারাত্মক হওয়ায় কেউই বাঁচেনি।

এই স্থানটি সক্রিয় হাতি করিডর নয়, তাই প্রশ্ন উঠছে—

  • ট্রেন কি অতিরিক্ত গতিতে ছিল?

  • রেল ও বন দফতরের মধ্যে সমন্বয় কতটা দুর্বল?

  • হাতির চলাচল সম্পর্কে আগাম সতর্কতা কি ছিল না?

ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।

লাইনচ্যুত কোচ ও হাতির দেহাংশ সরাতে অনেক সময় লেগেছে।উত্তর–পূর্বাঞ্চলের একাধিক রুটে ট্রেন দেরিতে চলছে।ক্ষতিগ্রস্ত কোচের যাত্রীদের অন্য বগিতে স্থানান্তর করা হয়েছে, গুয়াহাটি পৌঁছে অতিরিক্ত কোচ জুড়ে তাঁদের গন্তব্যে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

যদিও এই ঘটনা নতুন নয়। সরকারি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে—২০০৯-১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রেনের ধাক্কায় দেশে অন্তত ১৮৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

এই কারণেই ১৪টি রাজ্যের ৭৭টি রেলপথকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
বন, রেল ও পরিবেশ মন্ত্রকের যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছে চিন্তার অনেক দিক—

  • ঘন বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে রেললাইন

  • ট্রেনের গতি

  • রাতে অন্ধকারে হাতির চলাচল

  • সেতু, জলনিকাশি ব্যবস্থা ইত্যাদির সীমাবদ্ধতা

সমীক্ষায় প্রস্তাবিত নিরাপত্তা কাঠামো (৭০৫টি):

  • ৫০৩টি র‍্যাম্প ও লেভেল ক্রসিং

  • ৭২টি সেতুর সম্প্রসারণ

  • ৬৫টি আন্ডারপাস

  • ২২টি ওভারপাস

  • ৩৯টি ব্যারিকেড বা ট্রেঞ্চ

  • ৪টি এক্সিট র‍্যাম্প

লক্ষ্য—হাতির নিরাপদ পথ নিশ্চিত করা এবং সংঘর্ষ এড়ানো।

অসম, কর্ণাটক, কেরল—সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল

২০১৭ সালের গণনা অনুযায়ী—

  • কর্ণাটকে ৬,০৪৯

  • অসমে ৫,৭১৯

  • কেরলে ৫,৭০৬

  • তামিলনাড়ুতে ২,৭৬১

হাতির বসতি সবচেয়ে বেশি।এই রাজ্যগুলির মধ্য দিয়েই বহু ব্যস্ত রেললাইন গেছে—যার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি চরমে।অসমে এবার ১৩১টি নতুন র‍্যাম্প ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে, কারণ সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা এখানেই ঘটে।

প্রসঙ্গত এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—রাষ্ট্র যত দ্রুতগতির রেল প্রকল্প এগোচ্ছে, ততই বন্যপ্রাণীর জীবনে বিপদ বাড়ছে।হাতি একটি অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী, এবং তাদের মৃত্যু শুধু পরিবেশের নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি। বন ও রেলের সমন্বিত সতর্কতা ব্যবস্থা, সেন্সর-ভিত্তিক নজরদারি, করিডর চিহ্নিতকরণ, এবং গতিনিয়ন্ত্রণ—এই সবই এখন সময়ের দাবি। অসমের এই ঘটনা সেই প্রয়োজনের কথাই আরও জোরালোভাবে সামনে আনল।