কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক :

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে আরও সুরক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কার্যকর করে তুলতে বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল কেন্দ্র। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির ঝুমাগাছ সীমান্ত চৌকি (বর্ডার আউটপোস্ট বা বিওপি) পরিদর্শন থেকে শুরু করে কলকাতায় রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক—দু'দিনের সফরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট বার্তা দিলেন, দেশের পূর্ব সীমান্তে আর শুধুমাত্র কাঁটাতারের বেড়া নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ভিত্তি হবে আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান এবং সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে তিনি অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, সাইবার অপরাধ, জঙ্গি নেটওয়ার্ক এবং মাওবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আরও কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেন।

শনিবার শিলিগুড়ির ঝুমাগাছ সীমান্ত চৌকিতে পৌঁছে বিএসএফের আধিকারিকদের সঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষার বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ঘুরে দেখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কেউ কাটার বা ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করলেই যাতে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়, সেই উদ্দেশ্যে তৈরি দেশীয় রেডিও-ভিত্তিক ফেন্স ব্রিচ ডিটেকশন সিস্টেম বিশেষভাবে তাঁর নজর কেড়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্তে সামান্য নাশকতার চেষ্টাও মুহূর্তের মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে বিএসএফের দাবি।

শুধু তাই নয়, নদী, খাল, জলাভূমি কিংবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা সম্ভব নয়, সেখানে ইনফ্রারেড অ্যালার্ম প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও খতিয়ে দেখেন তিনি। অদৃশ্য ইনফ্রারেড রশ্মি কেউ অতিক্রম করলেই সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বহু সংবেদনশীল অংশে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের দৈনন্দিন যাতায়াত যাতে নির্বিঘ্ন থাকে এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তায় কোনও ফাঁক না থাকে, তার জন্য তৈরি আধুনিক গেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-ও পরিদর্শন করেন অমিত শাহ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুমোদিত ব্যক্তিদের যাতায়াত ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত হবে এবং সন্দেহজনক গতিবিধি সহজেই শনাক্ত করা যাবে।

এই সফরেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিএসএফের একাধিক পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের শিলান্যাস করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনটি নতুন প্রকল্পে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা এবং নতুন সীমান্ত বেড়া নির্মাণে আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার সীমান্ত উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা হয়। এর মধ্যে নতুন সীমান্ত চৌকি নির্মাণ, অতিরিক্ত কাঁটাতারের বেড়া এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সীমান্ত সফরে বিএসএফ জওয়ানদের সঙ্গে 'প্রহরী সম্মেলন'-এ সরাসরি কথা বলেন অমিত শাহ। সীমান্তে টানা দায়িত্ব পালন, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবারের কল্যাণ নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা শোনেন তিনি। জওয়ানদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁদের অবদান অনন্য এবং তাঁদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

পরে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক সীমান্তকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং অভেদ্য করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে ‘স্মার্ট বর্ডার’ বা চারস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়। এই ব্যবস্থায় থাকবে অত্যাধুনিক সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নজরদারি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ এবং রিয়েল-টাইম প্রতিক্রিয়া। তাঁর দাবি, এই প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কারণ ভারতের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলির অন্যতম এই রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু ও মাদক পাচার, জাল নোট এবং মানব পাচারের মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।

শিলিগুড়ির কর্মসূচির পর রবিবার কলকাতায় এসে রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্ত ও নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন অমিত শাহ। আলিপুরের সভাঘরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের ডিজি, কলকাতা পুলিশের কমিশনার, বিএসএফ, সিআরপিএফ, এনআইএ, সিআইডি, এসটিএফ, নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা।

বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ। সূত্রের খবর, সীমান্তে নজরদারি আরও বাড়ানো, বেআইনি ভাবে ভারতে বসবাসকারীদের চিহ্নিত করা এবং আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উপর জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সীমান্ত নিরাপত্তা শুধুমাত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; রাজ্য পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে।

কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, শহরে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিক এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানকারীদের শনাক্ত করতে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হচ্ছে। এই বাহিনীর কাজ হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বৈঠকে উত্তরবঙ্গের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ হওয়ায় এই করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে সেখানে নতুন সীমান্ত চৌকি, নজরদারি বাড়ানো এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ আরও জোরদারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই সঙ্গে রাজ্যে মাওবাদী কার্যকলাপের সম্ভাবনা সম্পর্কেও সতর্ক করেন। জঙ্গলমহল-সহ সংবেদনশীল এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে মাওবাদী কার্যকলাপ অনেকটাই কমেছে ঠিকই, কিন্তু কোনওভাবেই যাতে নতুন করে সেই তৎপরতা মাথাচাড়া না দিতে পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।

শুধু সীমান্ত নয়, বৈঠকে উঠে আসে সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধচক্র, মানব পাচার এবং মাদক পাচারের বিষয়ও। বিভিন্ন মামলার তদন্তের অগ্রগতি, পলাতক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও দ্রুত করার উপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি রাজ্যে নতুন তিনটি ফৌজদারি আইন কার্যকর করার অগ্রগতি এবং জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তিকরণ ব্যবস্থার বাস্তবায়নও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

দু'দিনের এই সফরের মাধ্যমে কেন্দ্র কার্যত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে সীমান্ত নিরাপত্তার আগামী অধ্যায় হবে প্রযুক্তিনির্ভর, সমন্বিত এবং তথ্যভিত্তিক। একদিকে যেমন ‘স্মার্ট বর্ডার’-এর মাধ্যমে সীমান্তকে আরও সুরক্ষিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, অনুপ্রবেশ রোধ, জঙ্গি কার্যকলাপ, মাওবাদী তৎপরতা, মানব ও মাদক পাচার এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে বহুমুখী কৌশল গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র। প্রশাসনিক মহলের মতে, শিলিগুড়ি ও কলকাতায় অমিত শাহর ধারাবাহিক বৈঠক এবং ঘোষণাগুলি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, আগামী দিনের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরল।


Amit Shah Unveils Smart Border Vision in Siliguri, Pushes High-Tech Surveillance and Tougher Action Against Infiltration, Maoist and Terror Threats

Union Home Minister Amit Shah has outlined an ambitious technology-driven security strategy for India's eastern frontier during his two-day visit to West Bengal, emphasizing that the future of border protection lies in a "Smart Border" model combining advanced surveillance systems, modern infrastructure, real-time intelligence sharing and coordinated security operations.

During his visit to the Jhumagach Border Outpost in Siliguri, Shah inspected indigenous security technologies including radio-based fence breach detection systems, infrared intrusion alarms and digital gate management solutions designed to prevent infiltration while facilitating secure movement for border residents. He also virtually inaugurated BSF infrastructure projects worth nearly ₹77 crore, including new border outposts, fencing and surveillance facilities.

Addressing BSF personnel, the Home Minister praised their service and reiterated the Centre's commitment to improving their welfare. He announced that West Bengal would be among the first states where the Smart Border initiative would be implemented, citing persistent challenges such as illegal infiltration, cross-border smuggling, fake currency networks and human trafficking along the India-Bangladesh border.

On the second day of his visit in Kolkata, Shah chaired a high-level security review meeting attended by senior officials from the West Bengal Police, Kolkata Police, BSF, CRPF, NIA, CID, STF, Intelligence Bureau and other central agencies. The meeting focused on strengthening border security, identifying illegal immigrants, tackling cybercrime, human trafficking, narcotics smuggling and preventing any resurgence of Maoist or terrorist activities.

Special attention was also given to the strategic Siliguri Corridor, popularly known as the "Chicken's Neck," with discussions on expanding surveillance infrastructure and intelligence coordination. Shah reportedly directed agencies to intensify monitoring of sensitive border areas and ensure strict legal action against illegal infiltration while enhancing cooperation between central and state law enforcement agencies.

The Centre believes that integrating cutting-edge technology with stronger intelligence networks and modern infrastructure will significantly reduce cross-border crime and strengthen India's national security framework in the years ahead.