কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :২২ ডিসেম্বর
এক সময় যাঁর নাম শুনলে কেঁপে উঠত মুম্বই, সেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেতাজ বাদশা হাজি মস্তান। ছয় ও সাতের দশকে যাঁর প্রভাব ছায়া ফেলেছিল অপরাধজগৎ থেকে রাজনীতি পর্যন্ত। দাউদ ইব্রাহিমের উত্থানও হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। সেই হাজি মস্তানের মেয়েই আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে—ন্যায়বিচারের আশায় দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দরজায় কড়া নাড়ছেন।
নিজেকে ধর্ষণ, নির্যাতন এবং খুনের চেষ্টার শিকার বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah-এর কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন হাজি মস্তানের কন্যা Hasin Mastan Mirza। তাঁর আর্জি —“আমাকে বাঁচান, আমাকে ন্যায়বিচার দিন।”
রবিবার সংবাদসংস্থা ANI-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়েন হাসিন। তাঁর অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে পরিবারের চাপে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি নাবালিকা।
হাসিনের দাবি, পরিচয় গোপন রেখে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয় এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি আগেই বিবাহিত ছিলেন। বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তাঁর অভিযোগের তালিকায় রয়েছে—যৌন নির্যাতন, সম্পত্তি হাতানোর ষড়যন্ত্র এবং একাধিকবার খুনের চেষ্টা।
সাক্ষাৎকারে হাসিন জানান, নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি তখন খুব ছোট। কী করব, কোথায় যাব—কিছুই বুঝতাম না।”
বিয়ের পর থেকে বাবার বাড়ির সঙ্গে তাঁর কার্যত কোনও যোগাযোগ ছিল না বলেও অভিযোগ করেন হাসিন। এমনকি বাবার মৃত্যুর খবরও তিনি পেয়েছিলেন দু’বছর পরে।
ব্যক্তিগত যন্ত্রণার পাশাপাশি আইন ও সমাজ নিয়ে নিজের মতও প্রকাশ করেছেন হাসিন। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এক ভিডিওতে তিনি তিন তালাক রদের জন্য মোদী সরকারের প্রশংসা করেন।
হাসিন বলেন, “তিন তালাক আইন খুব ভালো। মোদীজি ভালো আইন এনেছেন। ইসলামে এই প্রথার অপব্যবহার হচ্ছিল। এই বিল পাস হওয়ায় মুসলিম মহিলারা মোদীজির পাশে আছেন।”
এর পরেই নিজের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন আইনি লড়াই করেও তিনি ন্যায়বিচার পাননি। তাই শেষ আশ্রয় হিসেবে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন।
হাসিনের বক্তব্য, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধে আরও কঠোর আইন প্রয়োজন। তাঁর মতে, “কড়া আইন হলে অপরাধীরা ভয় পাবে। ভুক্তভোগীদের যেন বছরের পর বছর ধরে আদালতের দরজায় ঘুরতে না হয়।”
এই দাবি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়, বরং অসংখ্য নিপীড়িত নারীর কণ্ঠস্বর বলেই মনে করছেন অনেকে।
হাসিন মস্তান মির্জার বাবা Haji Mastan-এর জন্ম হয়েছিল তামিলনাড়ুতে। পরবর্তীতে মুম্বইয়ে এসে সোনা, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও বিলাসবহুল পণ্যের চোরাচালানের মাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের জায়গা পোক্ত করেন তিনি।
এক সময় রাজনীতি, ব্যবসা ও চলচ্চিত্র জগতের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। জীবনের শেষ পর্যায়ে সমাজসেবায় যুক্ত হন হাজি মস্তান। ১৯৯৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এক সময় যাঁর নামেই কেঁপেছিল মুম্বই, আজ তাঁর মেয়েই নিজের জীবনের নিরাপত্তা আর ন্যায়বিচারের জন্য রাষ্ট্রের দ্বারস্থ। হাজি মস্তানের পরিচয় হয়তো অতীতের ইতিহাস, কিন্তু হাসিন মস্তান মির্জার লড়াই আজকের বাস্তব—যেখানে ক্ষমতা, আইন ও মানবিকতার পরীক্ষাই শেষ কথা।
Continue With Google
Comments (0)