কলকাতা টাইমস নিউজ  :নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা :১১ ডিসেম্বর

দার্জিলিংয়ের ম্যাল রোডে হাঁটলে পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে যে ঘ্রাণটি সবচেয়ে আগে মনে ছোঁয়া দেয়, সেটি Glenary’s-এর। ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই রেস্তোরাঁ আজ আর শুধু খাবারের জায়গা নয়—এটি এক স্মৃতি, একটি পরিবেশ, একটি আবেগ। বহু প্রজন্ম ধরে পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পাহাড়ি জীবনের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে এই জায়গাটি।

কিন্তু সেই ১৪০ বছরের ঐতিহ্যে আচমকা নেমে এল প্রশাসনিক তালা। ৯ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী তিন মাসের জন্য গ্লেনারিজের বার ও লাইভ মিউজিক বিভাগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন ও পশ্চিমবঙ্গ এক্সাইজ ডিপার্টমেন্ট।
আর তাতেই কেঁপে উঠেছে দার্জিলিংয়ের শীতকালীন পর্যটন প্রস্তুতি।

প্রশাসনের অনুসন্ধানে যে অভিযোগগুলি উঠে এসেছে, তা হল—

১. West Bengal Excise (Foreign Liquor) Rules, 1998–র ২৩৯ নম্বর ধারা লঙ্ঘন

লাইভ ব্যান্ড পারফরম্যান্সের জন্য আলাদা অনুমতি প্রয়োজন। অভিযোগ, সেই অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর সঙ্গীত পরিবেশিত হয়েছে।

২. বার লাইসেন্স নবায়নে অনিয়ম বা ঘাটতির অভিযোগ

মদ বিক্রি ও সঞ্চয়ের লাইসেন্স নিয়মমাফিক নবায়ন হয়নি বলে দাবি প্রশাসনের।

৩. অনুমোদন ছাড়াই কিছু স্থাপত্যগত পরিবর্তন

বারের ভিতরে পরিকাঠামো রদবদল হয়েছিল, যা সরকারি অনুমতি ছাড়াই করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

প্রশাসনের দাবি, নিয়ম ভাঙা হয়েছে বারবার। তাই "বেআইনি কার্যকলাপ রুখতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন"—এই অবস্থান স্পষ্ট জানানো হয়েছে।

মালিকের ক্ষোভ: ‘এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া কিছু নয়’

গ্লেনারিজের কর্ণধার অজয় এডওয়ার্ড এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর কথায়—

“আমার সব কাগজপত্র ঠিকঠাক। লাইভ মিউজিকের অনুমতির জন্য পুলিশের দপ্তরে আবেদন করেছি। সেই অনুমতি প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি—তার দায় কেন আমাদের নিতে হবে?”

তিনি আরও বলেন—

“ঠিক একদিন আগেও ব্যবসা সচল ছিল। হঠাৎ এই রেড—এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পাহাড়ে জনস্বার্থে সেতু নির্মাণ করেছি। বরং সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

অজয় এডওয়ার্ড আশঙ্কা করছেন—এই তিন মাসে তাঁর ব্যবসায় প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি লোকসান হতে পারে।

দার্জিলিংয়ের শীতকাল শুধু আবহাওয়া নয়—এটি পর্যটনের উৎসব। ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার—গোটা পাহাড় ভরে ওঠে আলো, হাসি আর সঙ্গীতে। সেই সময়ে গ্লেনারিজের বার ও লাইভ মিউজিক বিভাগ ছিল প্রধান আকর্ষণ।
কিন্তু সেই আনন্দে বাদ সাধছে এই নিষেধাজ্ঞা।

  • বড়দিন ও নববর্ষের বহু বুকিং ইতিমধ্যে বাতিল হয়ে গেছে

  • প্রতিদিন লাইভ মিউজিক করতেন যাঁরা—কমপক্ষে আটজন শিল্পীর রোজগার বন্ধ

  • মোট ২৫০ কর্মচারী পড়েছেন অনিশ্চয়তার মুখে

  • সিজনে আরও ৫০ জনের বেশি কর্মী কাজ পেতেন—তারাও ক্ষতিগ্রস্ত

পর্যটন-নির্ভর দার্জিলিংয়ের অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মধ্যে। এই নিষেধাজ্ঞায় তার প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা অনেকের।


পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের  প্রশ্নে  এখন উকি মারছে বহু তথ  তবে কি গ্লেনারিজ কি শুধু একটি রেস্তোরাঁ? নাকি দার্জিলিংয়ের পরিচয়ের অংশ ?

এ প্রশ্নের মুখোমুখি বলা যায় Glenary’s এর গুরুত্ব শুধু খাবার বা বার সার্ভিসে নয়।
এটি —

  • দার্জিলিংয়ের ব্রিটিশ ঐতিহ্যের শেষ সাক্ষী

  • পর্যটকদের সবচেয়ে প্রিয় মধুর স্মৃতির জায়গা

  • স্থানীয় তরুণদের মিউজিক কালচারের অন্যতম কেন্দ্র

  • পাহাড়ের আতিথেয়তার মূল প্রতীক

এমন একটি জায়গা যখন হুট করে ৯০ দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—

  1. পর্যটন-নির্ভর পাহাড়ে এর অর্থনৈতিক অভিঘাত কে সামলাবে?

  2. ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা কি প্রশাসনিক নথির ভুল বোঝাবুঝির শিকার হতে পারে?

  3. রাজনৈতিক চাপ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—কোনটি এখানে বড় প্রভাবক?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর কেবল আইন নয়, পাহাড়ের মানুষের অনুভূতিও খুঁজবে।

অন্যদিকে প্রশাসন তার কাজ করছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই।
কিন্তু গ্লেনারিজের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং মানবিক বিবেচনাও সমান প্রয়োজন,কারণ Glenary’s একদিনের জন্য বন্ধ থাকা মানে—

  • দার্জিলিংয়ের আতিথেয়তার চেনা ছবি বদলে যাওয়া

  • পাহাড়ে পর্যটনের রঙ ফিকে হওয়া

  • বহু পরিবারের রোজগারের পথ বন্ধ হওয়া

  • এবং সবচেয়ে বড় কথা—ঐতিহ্যের উপর অনিশ্চয়তার ছায়া পড়া

এখন প্রয়োজন,আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও জনগণের মধ্যে ন্যায্য আলোচনার পথ খুলে দেওয়া—যাতে ঐতিহ্যও বাঁচে, শৃঙ্খলাও বজায় থাকে। বাকিটা সময়ের সাথে দেখা ।