কলকাতা টাইমস নিউজ  :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :২২ ডিসেম্বর

গানের মঞ্চ—যেখানে থাকার কথা সুর, আলো আর দর্শকের হাততালি। অথচ সেখানেই ভয়, অপমান আর নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হলেন এক শিল্পী। পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরে শনিবার রাতে এক বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অনুষ্ঠানে গাইতে গিয়ে মঞ্চেই হেনস্থার অভিযোগ তুললেন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী Lognojita Chakraborty। অভিযোগের ভিত্তিতে স্কুলের এক মালিক Mehbub Mallik-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

শনিবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ ভগবানপুরের একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শুরু হয় লগ্নজিতার গানের অনুষ্ঠান। প্রথম ৪৫ মিনিট নির্বিঘ্নেই চলে অনুষ্ঠান—দর্শকদের হাততালি, পরিচিত সুরে ভরে ওঠে অডিটোরিয়াম। এরপর ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবির একটি গান পরিবেশন করেন শিল্পী।

সেখানেই মোড় ঘোরে। অভিযোগ, গান শেষ হতেই দর্শকাসন থেকে উঠে এসে এক ব্যক্তি মঞ্চে ওঠেন। আচরণে স্পষ্ট মারমুখী ভঙ্গি। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, শিল্পীকে নিরাপত্তার কথা ভেবে মঞ্চ ছেড়ে নামতে হয়।

ঘটনার রাতেই Bhagabanpur থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন লগ্নজিতা। অভিযোগপত্রে তাঁর বক্তব্য, ‘জাগো মা’ গানটি গাওয়ার পরই ওই ব্যক্তি প্রকাশ্যে শারীরিক হেনস্থার চেষ্টা করেন। কার্যত মারধরের মতো মুডে ছিলেন তিনি। শিল্পীর অভিযোগ, ওই ব্যক্তি বলেন—“অনেক জাগো মা হয়েছে, এবার সেক্যুলার কিছু গাও।” অভিযুক্ত ব্যক্তি মেহবুব মল্লিক, যিনি স্কুলের অন্যতম মালিক।

ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে লগ্নজিতা বলেন, “১১ বছর ধরে স্টেজ শো করছি। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনও হতে হয়নি। যে গানটা গেয়েছি, সেটা আমার খুব প্রিয়। ভবিষ্যতেও গাইব। কিন্তু গান গাইতে উঠে যদি একজন শিল্পীকে এই ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়, তা হলে সেটা খুবই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা।”

এই বক্তব্য শুধু একজন শিল্পীর ক্ষোভ নয়—এ যেন মঞ্চে নারীর নিরাপত্তা, শিল্পীর স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে সহনশীলতার প্রশ্নও তুলে দিল।

পূর্ব মেদিনীপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার Mithunkumar De জানান, “অভিযোগ পেয়েই তদন্ত শুরু করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপন করেছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গায়িকার সঙ্গেও কথা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। বিজেপি নেতা Shankudeb Panda অভিযোগ করেন, “এই স্কুলের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের যোগ রয়েছে বলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস পেয়েছে অভিযুক্ত।”

পাল্টা জবাব দেন রামনগরের বিধায়ক Akhil Giri। তাঁর বক্তব্য, “এটা একটা স্কুলের অনুষ্ঠান। যে কোনও ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলকে জড়িয়ে দেওয়াই বিজেপির অভ্যাস।”

স্কুল পরিচালন কমিটির সদস্য Sheikh Jane Alam জানান, “ছয় বছর ধরে আমাদের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। এর জন্য কমিটিও গঠন করা হয়। এমন ঘটনা ঘটবে ভাবতেই পারিনি।”

এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিল—গানের মঞ্চ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে শিল্পী সুরে মানুষকে একত্র করেন, সেখানে কি শিল্পীর নিরাপত্তা নিশ্চিত? মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গান বাছাইয়ের অধিকার—সব কিছুর ঊর্ধ্বে কি থাকা উচিত না শিল্পীর সম্মান ও নিরাপত্তা?

লগ্নজিতার অভিযোগের পর গ্রেপ্তার হলেও, এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়—একজন শিল্পীকে মঞ্চে উঠে গান গাইতে গিয়ে কেন ভয় পেতে হবে ?