কলকাতা টাইমস নিউজ  : নিউজ ডেস্ক  : কলকাতা :৩০ জানুয়ারি ২০২৬


বিদায়ের আগে যেন রেখে গেলেন এক অন্তর্মুখী উপদেশ। প্রশাসনিক ভাষণ নয়, রাজনৈতিক মন্তব্যও নয়—বরং একেবারে ব্যক্তিগত সুরে।
“আমাদের কাজই শেষ কথা বলবে। নিজের বিবেকই বলবে আমরা ঠিক না ভুল। সত্যিকারের সাহস ভিতর থেকে আসে।”

আলিপুর বডিগার্ড লাইন্সে নিজের ফেয়ারওয়েল প্যারেডে রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব কুমার এই কথাগুলি বলতেই পুলিশমহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। আগামিকাল, শনিবার তাঁর কর্মজীবনের শেষ দিন। অবসরের ঠিক আগে তাঁর এই ‘বিবেক–বার্তা’ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা।

দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে সহকর্মীদের উদ্দেশে রাজীবের বক্তব্যে ছিল দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসের মিশেল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন,
“লোকে কী বলল, টিভি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী লেখা হল—সে সব নয়, আমাদের কাজই আমাদের পরিচয় দেবে।”

পুলিশকর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা—কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পেলে চলবে না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকাই প্রকৃত সাহস। তবে একইসঙ্গে সতর্ক করে দেন,
“সাহস মানে গুলি চালানো নয়, মানুষ মারা নয়। সাহস মানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।”

রাজীবের অবসরের মুখে নতুন স্থায়ী ডিজিপি কে হবেন, তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। ডিজিপি নিয়োগ সংক্রান্ত সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (CAT)–এর নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ইউপিএসসি দিল্লি হাইকোর্টে গিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ৩ ফেব্রুয়ারি।
ফলে আপাতত রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এই আবহেই রাজীবের বক্তব্যকে অনেকে ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বলেই মনে করছেন।

ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে একাধিক ঘটনায় তাঁর মন্তব্য শিরোনামে এসেছিল।
উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখরে এক অভিযুক্ত পুলিশকে গুলি করে পালানোর ঘটনায় তিনি বলেছিলেন—
“আমাদের একটা গুলি করলে আমরা চারটে গুলি চালাব।”

এই বক্তব্যে অনেকেই মনে করেছিলেন, আক্রান্ত পুলিশবাহিনীর মনোবল বাড়াতেই এমন কড়া বার্তা। পরবর্তীতে ওই অভিযুক্ত পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত হয়।

তবে তাঁর আমল বিতর্কমুক্ত ছিল না।
অনুব্রত মণ্ডলের ফোন–হুমকি কাণ্ডে পুলিশের নীরবতা কিংবা সন্দেশখালির ত্রাস শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে দেরিতে পদক্ষেপ—এসব নিয়ে সমালোচনা হয়েছে প্রবল। এমনকি একটি ঘটনায় প্রকাশ্যে ‘ভুল স্বীকার’ করতেও শোনা গিয়েছিল তাঁকে।

ফলে তাঁর কর্মজীবন যেমন সাফল্যে ভরা, তেমনই বিতর্কও কম নয়—এই মত অনেকের।

পুলিশের কাজের জটিলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজীব বলেন,“পশ্চিমবঙ্গ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল জিও-পলিটিক্যাল জোন। একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভুটান-নেপাল, আবার উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখতে হয়।”

পুজো, গঙ্গাসাগর মেলা, মাওবাদী দমন—সব ক্ষেত্রেই রাজ্য পুলিশের ভূমিকাকে তিনি ‘দেশের সেরা’ বলে উল্লেখ করেন।
তাঁর কথায়,
“শুধু অফিসার নয়, হোমগার্ড, সিভিক—সবাই মিলে আমরা একটা পরিবার।”

একজন শীর্ষ পুলিশকর্তার শেষ দিনের বার্তা সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক হয়। কিন্তু রাজীব কুমারের ভাষণে ছিল ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা, আত্মসমালোচনা আর বিবেকের কথা।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এ কি শুধু বিদায়ী আবেগ, না কি ভবিষ্যৎ প্রশাসনের জন্য নীরব বার্তা?

রাজ্য পুলিশের অন্দরে এখন সেই আলোচনা জোরদার।