কলকাতা টাইমস নিউজ  :কলকাতা :১৮ মার্চ ২০২৬

  বিস্তারিত দেবজিৎ গাঙ্গুলীর কলমে :

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে সামনে রেখে রাজনৈতিক লড়াই যত তীব্র হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিটি দলের কৌশল। সেই প্রেক্ষাপটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা যেন একাধিক বার্তা একসঙ্গে বহন করছে। শুধু প্রার্থী ঘোষণা নয়, এই তালিকা কার্যত একটি রাজনৈতিক রণকৌশলের প্রতিফলন—যেখানে নারীশক্তি, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক, অনগ্রসর শ্রেণি এবং নবীন-প্রবীণের ভারসাম্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই তালিকা নিছক প্রার্থী বাছাই নয়, বরং ভোটের অঙ্ক কষে তৈরি করা এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস আবারও সেই পরিচিত সামাজিক সমীকরণকেই সামনে রেখে ভোটের ময়দানে নামল, যা গত কয়েকটি নির্বাচনে তাদের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি ছিল।

সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে মহিলা প্রার্থীদের সংখ্যা। এবারের তালিকায় ৫২ জন মহিলা প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছে তৃণমূল। ২০২১ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ৫০, সেখানে আরও দু’জন বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে এখনও ‘নারী শক্তি বন্দন আইন’ কার্যকর না হলেও, তৃণমূল নিজের উদ্যোগেই মহিলা প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—মহিলা ভোটব্যাঙ্ক তাদের অন্যতম শক্তির জায়গা। বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারী ভোটারদের প্রভাব যে ক্রমশ বাড়ছে, তা মাথায় রেখেই এই কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দিকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে দল। ২০২১ সালে যেখানে ৪২ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী ছিল, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭। এই বৃদ্ধি যদিও খুব বড় নয়, তবুও তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে এই কৌশল কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।

তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও তৃণমূলের অবস্থান নজরকাড়া। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে ৮৪টি আসন সংরক্ষিত হলেও, তৃণমূল এবার ৯৫ জন এসসি-এসটি প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছে। অর্থাৎ সংরক্ষিত আসনের বাইরেও এই শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হয়েছে। ২০২১ সালের মতোই এবারও এই সংখ্যাটি প্রায় একই স্তরে রাখা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায়—অনগ্রসর শ্রেণির ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে দল কতটা সচেষ্ট।

তবে শুধু সামাজিক সমীকরণ নয়, প্রার্থী তালিকায় বয়সের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ৩১ থেকে ৫০ বছর বয়সি প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৪৪ শতাংশ। এর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বও রয়েছে, আবার প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রার্থীকেও রাখা হয়েছে তালিকায়। এই সমন্বয় থেকেই বোঝা যায়, তৃণমূল একদিকে নতুন মুখ তুলে আনতে চাইছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের উপরও ভরসা রাখছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর দল তিনটি প্রজন্মকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ছাত্র-যুব আন্দোলনের মুখ থেকে শুরু করে ক্রীড়াজগত ও সংস্কৃতি জগতের প্রতিনিধিদেরও প্রার্থী করা হয়েছে। দেবাংশু ভট্টাচার্যের মতো যুব মুখ কিংবা বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্তি সেই চিত্রকেই স্পষ্ট করে।

সব মিলিয়ে, তৃণমূলের এই প্রার্থী তালিকা একটি বহুস্তরীয় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। নারীশক্তি, সংখ্যালঘু, অনগ্রসর শ্রেণি এবং নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে তৈরি এই তালিকা যে আসন্ন নির্বাচনে বড় ভূমিকা নিতে চলেছে, তা বলাই যায়। এখন দেখার, এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ভোটের বাক্সে কতটা সাফল্য এনে দিতে পারে শাসক দলকে।