কলকাতা টাইমস নিউজ :কলকাতা :২০ নভেম্বর
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ফের উত্তাল রাজনীতি। এবার সরাসরি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখে এসআইআর স্থগিত রাখার দাবি জানালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ—এটি পরিকল্পনাহীনভাবে চালানো হচ্ছে, যা শুধু বিশৃঙ্খলই নয়, বরং বিপজ্জনক। সাম্প্রতিক সময়ে দুই বুথ লেভেল অফিসারের (বিএলও) মৃত্যু ও একাধিক অসুস্থতার ঘটনায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট বলে দাবি করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন—এত বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, নির্দেশাবলী অস্পষ্ট, ফলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে। এই চাপের বোঝা বইতে হচ্ছে বিএলও-দের, যাঁরা ভোটার নথি সংগ্রহ, যাচাই ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কাজের দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য—“অতিরিক্ত কাজের চাপে বিএলও-দের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিপন্ন হচ্ছে।”
মমতার দাবি—বর্তমানে গ্রামীণ বাংলায় কৃষিকাজের ব্যস্ততম সময় চলছে। ধান চাষ ও কাটার মৌসুমে এসআইআর প্রক্রিয়ার মতো সময়সাপেক্ষ অভিযানে সাধারণ মানুষের উপরও অযৌক্তিক চাপ পড়ছে। তাঁর অভিযোগ, “অনেকেই মানসিক চাপে পড়ছেন। এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।”
ডুয়ার্সের মাল ব্লকের নিউ গ্লেনকো চা–বাগান এলাকার বাসিন্দা শান্তিমুনি ওঁরাওয়ের আত্মহত্যা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শান্তিমুনি ছিলেন একজন বিএলও, এবং অভিযোগ—এসআইআরের কাজের চাপেই তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন।
দিন কয়েক আগেই শিলিগুড়ির সরকারি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী এই একই অভিযোগ তুলেছিলেন—এসআইআর অবাস্তব পরিকল্পনা। এবার সেই বক্তব্যই চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেন কমিশনকে।
তিনি লিখেছেন—
-
প্রক্রিয়াটির মধ্যে কাঠামোগত ত্রুটি আছে
-
প্রশিক্ষণ নেই
-
নির্দেশ ও নথি সংক্রান্ত তথ্য পরিষ্কার নয়
-
মাঠপর্যায়ে সময়সীমা সম্পূর্ণ অবাস্তব
মমতা চিঠিতে সতর্ক করেছেন—“এই প্রক্রিয়া যদি অবিলম্বে সংশোধন করা না হয়, তবে তা সবার জন্য ক্ষতিকর হবে।”
অতীতেও তিনি বলেছিলেন—“নোটবন্দির পরে মানুষকে এবার এসআইআর–এর নামে বন্দি করা হচ্ছে।”
তাঁর অভিযোগ—এটি এক ধরনের ‘সুপার ইমার্জেন্সি’, যার লক্ষ্য রাজ্যের সরকারকে কাজ করতে বাধা দেওয়া। তৃণমূলও বারবার বলছে—২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ঘোষণার আগে দু’মাসের মধ্যে এত বিশাল কাজ শেষ করা অসম্ভব।
বিজেপির সাংসদ সুকান্ত মজুমদার অবশ্য বলছেন—
“নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সংস্থা। প্রয়োজন বোধ করলে কমিশন নিজেই সময়সীমা বাড়াবে বা সিদ্ধান্ত নেবে।”
এই মন্তব্যে বোঝা যায়, রাজ্যের শাসক দল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র আকার নিতে চলেছে।
বুধবার বিকেলের দিকে নবান্নে বসে যেন কাগজে-কলমে জমে থাকা ক্ষোভ উজাড় করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টেবিলে রাখা সরকারি প্যাডে কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে লিখলেন তিনি—এসআইআর প্রক্রিয়া যেন আর না এগোয়। কারণ, শুধু ‘পরিকল্পনাহীন কাজ’ নয়, তাঁকে ভাবাচ্ছে রাজ্যের দুই বিএলও-এর মৃত্যু। আটপৌরে মধ্যবিত্ত, সরকারি কাজে দিনরাত ছুটে বেড়ানো মানুষগুলো এত চাপ সামলাতে না পেরে ভেঙে পড়ছেন—এটাই তাঁর আক্ষেপ।
চা-বাগানের শ্রমিক শান্তিমুনি ওঁরাওয়ের মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই মুখ্যমন্ত্রীর চোখে ছিল অস্বস্তি। তিনি ছিলেন একজন বিএলও—এবং অভিযোগ, অতিরিক্ত চাপেই তাঁর জীবনের ইতি টানেন। এই ঘটনাই যেন পুরো বিষয়টাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।
ধান কাটার ব্যস্ত সময়ে গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে ভোটার নথি যাচাই করা—এটাকে অবাস্তব বলেই মনে করছেন মমতা। মানুষকে মানসিক চাপের মধ্যে ফেলা হচ্ছে বলেও দাবি তাঁর।
তিনি তাই চিঠিতে লিখেছেন—“এসআইআর অবিলম্বে স্থগিত করা হোক। প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। নথি পরিষ্কার করতে হবে। না হলে ক্ষতি হবে সকলেরই।”
কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয় এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।
Continue With Google
Comments (0)