কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক :
দুর্গাপুজো মানেই কলকাতার রাস্তায় মানুষের ঢল, আলো, ঢাকের বাদ্যি, নতুন পোশাক আর রাতভর ঠাকুর দেখার উন্মাদনা। কিন্তু সেই উন্মাদনার মধ্যেও মণ্ডপের পরিবেশ যেন কোনওভাবেই অশান্ত বা অসংযত না হয়ে ওঠে, সে জন্য এবার এক অভিনব এবং কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটছে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব। মণ্ডপে প্রবেশের আগে প্রয়োজনে দর্শনার্থীর মুখোমুখি হবে ব্রেথলাইজার। মদ্যপ অবস্থায় কাউকে মণ্ডপে ঢুকতে দেওয়া হবে না—এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৮১ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই পুজো কমিটি।
অর্থাৎ এবার চক্রবেড়িয়ার মণ্ডপে দুর্গাদর্শনের লাইনে দাঁড়িয়ে যদি কারও আচরণে মদ্যপানের লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে শুধু নিরাপত্তারক্ষীর প্রশ্নের মুখে পড়লেই হবে না, প্রয়োজন হলে যন্ত্রে ‘ফুঁ’ দিয়েও প্রমাণ করতে হতে পারে যে তিনি মদ্যপ অবস্থায় নেই। পুজো কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রবেশপথে নিরাপত্তারক্ষী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নজরদারি থাকবে। সন্দেহ তৈরি হলে ব্রেথলাইজার ব্যবহার করা হবে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে কলকাতা পুলিশের সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
চক্রবেড়িয়া সর্বজনীনের এই সিদ্ধান্ত অবশ্য শুধু অষ্টমীর জন্য নয়। চলতি বছরের পুজোয় তৃতীয়া থেকে দ্বাদশী পর্যন্ত মদ্যপ অবস্থায় দর্শনার্থীদের মণ্ডপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রাখার কথা জানিয়েছে কমিটি। ফলে রাজ্য সরকারের ঘোষিত অষ্টমীর ‘ড্রাই ডে’-এর সীমা ছাড়িয়ে নিজেদের মণ্ডপের ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ম কার্যকর করতে চাইছেন উদ্যোক্তারা।
এবারের সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে মূলত পুজোমণ্ডপের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। পুজোর দিনগুলিতে কলকাতার বিভিন্ন বড় মণ্ডপে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড় হয়। তার মধ্যে কেউ মদ্যপ অবস্থায় এসে অসংযত আচরণ করলে তা মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, মহিলা, প্রবীণ এবং পরিবারের সঙ্গে আসা দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখেই মণ্ডপের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, কাউকে অপমান করা বা অযথা হয়রানি করা উদ্দেশ্য নয়; বরং আগে থেকেই সতর্ক থেকে পুজোর পরিবেশকে শান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখা তাঁদের লক্ষ্য।
এই ব্যবস্থাকে বাস্তবে কার্যকর করার জন্য ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিটি তিনটি ব্রেথলাইজার সংগ্রহ করেছে এবং পুজোর আগে যন্ত্র ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে স্থানীয় পুলিশকর্মীদের সহায়তায় পরীক্ষামূলক মহড়াও হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে প্রায় ৩০ জনের একটি দল থাকার কথাও জানানো হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন পুজো কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরাও।
চক্রবেড়িয়ার এবারের পুজো অবশ্য শুধু এই অভিনব নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যই আলোচনায় নয়। ৮১তম বর্ষে পা দেওয়া এই ঐতিহ্যবাহী পুজোকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে নানা প্রস্তুতি। চলতি বছরের ভাবনায় রয়েছে ‘পদ্ম দিঘির ঘাটে’। জুলাই মাসেই খুঁটি পুজোর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এবারের উৎসবের প্রস্তুতি।
পুজোর ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবহ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাই এবার উদ্যোক্তাদের অন্যতম লক্ষ্য। আর সেই কারণেই মণ্ডপের পরিবেশ নিয়ে আগেভাগেই বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুজো কমিটির ভাবনায়, মণ্ডপ শুধুমাত্র দর্শনার্থীদের ভিড়ের জায়গা নয়; এটি একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার, সামাজিক মিলন এবং সাংস্কৃতিক পরিসর। ফলে সেই জায়গায় এমন কোনও আচরণ বরদাস্ত করা হবে না, যা অন্য দর্শনার্থীদের অস্বস্তিতে ফেলে।
এবারের পুজোয় এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বৃহত্তর পুজো-নির্দেশিকারও একটি যোগ রয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে দুর্গাপুজো সমন্বয় বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুজোর ঐতিহ্য, পবিত্রতা ও রীতি-নীতি বজায় রাখার উপর জোর দেন। রাজ্য সরকারের তরফে ২০২৬ সালের পুজোয় একাধিক নির্দেশিকাও ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর পড়ছে।
সরকারের ঘোষিত নিয়মের মধ্যে মহাষ্টমীর দিন মদ বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে পুজো ও বিসর্জনে ডিজে ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞার কথাও সরকারি বৈঠকের পর জানানো হয়েছে। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন নিজেদের মণ্ডপে আরও কড়া অবস্থান নিয়েছে।
তবে এই নিয়ম ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই উঠছে কিছু প্রশ্নও। মদ্যপ অবস্থায় কাউকে কী ভাবে চিহ্নিত করা হবে, কতটা সন্দেহ হলে ব্রেথলাইজার ব্যবহার করা হবে, পরীক্ষার ফল নিয়ে কোনও বিতর্ক তৈরি হলে কী হবে—এসব বিষয় বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে একটি পুজোমণ্ডপে প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্রেথলাইজার ব্যবহারের বিষয়টি সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছে একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। তাই নিয়ম প্রয়োগের সময় সংবেদনশীলতা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চক্রবেড়িয়ার উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বিচারে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে পরীক্ষা করার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী নজরদারি করা হবে। অর্থাৎ আচরণে মদ্যপানের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা গেলে তবেই পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে একদিকে যেমন পুজোর পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের অস্বস্তিও কমানো যাবে।
কলকাতার পুজো সংস্কৃতিতে মদ্যপানের প্রসঙ্গ অবশ্য নতুন নয়। পুজোর রাতে অনেকেই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দেন, খাওয়া-দাওয়া করেন। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত উদযাপন আর একটি ধর্মীয় পুজোমণ্ডপের পরিবেশ—দুই জায়গাকে আলাদা রাখাই চক্রবেড়িয়া কমিটির বক্তব্যের মূল জায়গা। উদ্যোক্তাদের মতে, কেউ ব্যক্তিগতভাবে কী করছেন, তা তাঁদের বিষয় নয়; কিন্তু মণ্ডপে প্রবেশের পরে আচরণে যেন অন্য দর্শনার্থীদের সমস্যা না হয়, সেটিই তাঁদের অগ্রাধিকার।
এই সিদ্ধান্ত তাই নিছক ‘মদ নিষিদ্ধ’ ঘোষণার মধ্যে আটকে থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে কলকাতার পুজো সংস্কৃতির বদলে যাওয়া চরিত্রও। একসময় পাড়ার পুজো ছিল মূলত স্থানীয় মানুষের মিলনক্ষেত্র। এখন বড় পুজোগুলি হয়ে উঠেছে হাজার হাজার মানুষের গন্তব্য। ফলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং দর্শনার্থীদের আচরণ—সবকিছুই পুজো পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চক্রবেড়িয়া সর্বজনীনের এবারের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে। পুজো কমিটি একদিকে ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিবেশের কথা বলছে, অন্যদিকে সেই পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তি। মণ্ডপে ঢোকার মুখে ব্রেথলাইজার সেই দুইয়ের সংযোগেরই একটি নজির।
আর তাই এবারের পুজোয় চক্রবেড়িয়ার মণ্ডপে ঢোকার আগে হয়তো অনেকের মনেই একটাই প্রশ্ন ঘুরবে—‘ঠাকুর দেখার আগে কি ফুঁ দিতে হবে?’ উত্তরটা অবশ্য সবার জন্য নয়। কিন্তু কারও আচরণে যদি মদ্যপানের সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে দুর্গাদর্শনের আগে সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারেন তিনি। উদ্যোক্তাদের বার্তা স্পষ্ট—পুজোর আনন্দ হোক, উৎসব হোক, আড্ডা হোক, কিন্তু মণ্ডপের ভিতরে চাই সংযম, শালীনতা এবং নিরাপদ পরিবেশ।
এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, পুজোর ভিড় সামলাতে কতটা সাহায্য করে এবং দর্শনার্থীরা বিষয়টিকে কী ভাবে গ্রহণ করেন, তার উত্তর মিলবে উৎসবের দিনগুলিতেই। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই পরিষ্কার—২০২৬-এর চক্রবেড়িয়া সর্বজনীনের পুজোয় ঢাকের তালে, আলোর ঝলকানির পাশাপাশি এবার আলোচনায় থাকবে আরও একটি শব্দ—‘ব্রেথলাইজার’।
আর মণ্ডপের দরজায় যেন অঘোষিত বার্তাটাই থাকবে—উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসুন, কিন্তু নেশা নয়।
Blow Before You Bow: Bhowanipore Durga Puja Pandal to Use Breathalysers Against Intoxicated Visitors
Chakraberia Sarbojanin Durgotsab in Bhowanipore Kolkata has introduced a unique entry rule for Durga Puja 2026. Visitors found intoxicated may be asked to undergo a breathalyser test before entering the pandal.
The 81-year-old puja committee plans to prevent intoxicated visitors from entering the pandal during the festival period. Security personnel and volunteers will monitor visitors and breathalysers will be used when there is suspicion of alcohol consumption.
The decision comes in the backdrop of the West Bengal government's 2026 Durga Puja guidelines including a dry day on Maha Ashtami and restrictions aimed at maintaining discipline and the sanctity of the festival.
The committee has reportedly conducted a mock demonstration of the breathalyser system with police assistance and plans to deploy a dedicated security team during the puja.
Is this a new way of ensuring safety and discipline at Kolkata Durga Puja pandals or will it create controversy among visitors?
Watch the full story to know what Chakraberia Sarbojanin Durgotsab has planned for Durga Puja 2026.
Continue With Google
Comments (0)